Templates by BIGtheme NET

বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় ঢাকাই মসলিন

-: সোহাগ মহাজন :-

মসলিন একটি বিস্ময়ের নাম, মসলিন একটি ইতিহাসের নাম, মসলিন একটি ঐতিহ্যের নাম, মসলিন একটি ট্র্যাজেডির নাম। হাজারো বিস্ময়ের জন্মদেয়া মসলিন, অযত্ন, অবহেলা আর শোষনের যাতাকলে পৃষ্ঠহয়ে ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি নাম হয়ে রয়ে গেছে। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ঢাকার কমিশনার ডানবার হয়তো ঠিকই বলেছিলেন “অবশেষে যে মসলিন শিল্প পৃথিবীময় সুনাম অর্জন করেছিল, তার নাম ও হয়তো কেও মনে রাখবেনা।” ডানবারের এই উক্তি আমরা মিথ্যা প্রমান করতে চাই। মসলিন শিল্প পূর্ণজীবিত করা প্রায় অসম্ভব আর এ শিল্পের পূর্ণজীবন কামনা করাও বাতুলতা মাত্র। তার পরও লিখলাম, আমাদের মুখে, আমাদরে মনে, আমাদের অন্তরে বেচে থাক “ঢাকাই মসলিন”।

dsc_1507-copyএকটি শাড়ী হয় কয় হাত? নিশ্চই বলবেন ৫ হাত। যদি বলি এই পাঁচ হাত লম্বা শাড়ী একটি হাতের আংটির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করানো যাবে? ব্যাপারটি কি বিশ্বাসযোগ্য। হয়তো বলবেন আমার বোধশক্তি লোপ পেয়েছে। আচ্ছা যদি আরো বলি যে, একটি পাঁচ হাত শাড়ীকে সুন্দরকরে ভাজ করে একটি বড় ম্যাচের বাক্সে ভরে রাখা সম্ভব। তাহলে হয়তো বলবেন আমি ম্যাজিকের কথা বলছি? না এটা ম্যাজিক না এটা বাস্তব। মসলিন কাপড় এতটাই বিস্ময়কর আর সূক্ষ ছিল যে, একটি পাঁচ হাত শাড়ীকে হাতের আংটির মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করানো যেতো এমন কি একটি বড় ম্যাচের বাক্সে ভাজ করে রেখে দেয়া যেত। ব্যাপারটা কেমন আশ্চর্য জনক তাই না? হ্যা এটাই হচ্ছে মসলিন কাপড় হাজারো প্রশ্নের জন্ম দেয়া মসলিন একটি বিস্ময়ের নাম একটি অত্যাশ্চর্য পন্যের নাম।

মসলিন শব্দের মূল নির্ণয় করা কঠিন। মসলিন ফারসি শব্দ নয়। সংস্কৃত বা বাংলা শব্দও নয়। ইতিহাসবিদ হেনরি উইল এবং এ,সি বার্নেল মনে করেন যে, মসিলন শব্দ মসুল নাম থেকে উদ্ভূত। মসুল বর্তমান ইরাকের অর্ন্তগত বিখ্যাত ব্যাবসাকেন্দ্র। যেহেতু মসুলে সব সময় ভালো ও উৎকৃষ্টমানের কাপড় তৈরী হতো তাই হয়ত ইউরোপীয় ও অনান্য অঞ্চলের লোকজন সূক্ষ এই সূতি বস্ত্রকে সাধারনভাবে মসুলী বা মসুলীন বা মসলিন নামে অভিহিত করত। পরে ঢাকায় সূক্ষ বস্ত্রের সন্ধান পেলে তারা তাকে নাম দেয় “ঢাকাই মসলিন”। এর বাইরে মসিলন শব্দের উদ্ভব বা মসুলকে মসলিন শব্দের মূল মনে করার যুক্তিসংগত আর কোন কারন খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা সময় ঢাকা শহর পরিচিত ছিল সমগ্র বিশ্বব্যাপী এই মসলিনের কারনে। এশিয়া, ইউরোপ এমনকি আফ্রিকাতেও পণ্য হিসেবে কদর ছিল মসলিনের। ইংরেজদের কোম্পানী আমলে শহর হিসেবে ক্ষয় শুরু হয় ঢাকার, অবনতি হতে থাকে মসলিন শিল্পের অবনতি হতে থাকে তাতী সম্প্রদায়ের এবং কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই মসলিন শিল্প।

বিলুপ্ত মসলিন আজ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। যে মসলিনের বিশ্বজোড়া কদর ছিল সেই মসলিন এখন গুটিকয়েক স্মৃতি হয়ে মিউজিয়ামে শোভা পাচ্ছে। বর্তমানে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া আলবার্ট মিউজিয়ামে ঢাকাই মসলিন রক্ষিত আছে এবং সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরেও মসলিন কাপড় সংরক্ষন করা হয়েছে। এছাড়া সারা বিশ্বে দু একটি বনেদি পরিবারের ব্যাক্তির মধ্যে মসলিন কাপড় সংরক্ষনে আছে তাদের মধ্যে হাজী ওসমান গনি রোডের বাসিন্দা জাহানারা বেগম এর কাছে মসলিনের একটি শাড়ী ছিল বর্তমান তার ছেলে এটি রক্ষনাবেক্ষন করছেন।

79765207230228ঢাকার ইতিহাস চারশো বছরের বেশী পূরনো নয়। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে (সময়ে) ১৬১০ সালে বাংলায় সুবেদার ইসলাম উদ্দীন খাঁন চীশতি রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থান্তরিত করার পর থেকে ঢাকা ইতিহাসে অবস্থান করে নেয় তাই ঢাকাই মসলিনের উল্লেখ মোগল আমলের আগে পাওয়া যায় না। ইংরেজ ও পরবর্তী সময়ে মসলিনের নিঃশেষ শুয়ে নেয়া, তাঁতী সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার, অবিচার আর মসলিনের ব্যাবসায়িক সিধান্তগুলো গ্রহন না করাই মসলিন শিল্পে ধংশের অন্যতম কারন হিসেবে বিবেচিত এবং পরবর্তীকালে মসলিনের যথাযথ সংরক্ষন, গবেষনার ঘাটতি আর গবেষকদের গাফলতির কারনে মসলিন সম্পর্কে বেশী কিছু জানা সম্ভবপর নয় যা জানার আছে তা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দলিল-এ উল্লেখ আছে।

কিন্তু বইটিতে গ্রন্থাকারের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তারপরও অনেকেরই ধারনা যে, এই বইটি জেম্স্ টেলর এর লেখা। ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর দলিল যে গুলো এখনো লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে রক্ষিত আছে। এবার আলোক পাত করা যাক মসলিন কাপরের উৎপাদন প্রসঙ্গ। যে কোন কাপড় তৈরী করতেই তিনটি স্তর পার করতে হয়- (১) কার্পাস সংগ্রহ (২) সুতা কাটা এবং কাপড় বয়ন। ঢাকাই মসলিনের বৈশিষ্ট্য ছিল যে কার্পাস উৎপাদন থেকে শুরু করে সকল স্তর ঢাকাতেই সম্পূর্ণ করা যেত। ঢাকার চাষীরাই কার্পাস উৎপন্ন করত, তাঁতীরাই সুতা কাটঁত এবং কাপড় বুনত এমনকি মসলিন তৈরীর মেশিন ও যাবতীয় সরঞ্জামাদি ঢাকাতেই পাওয়া যেত। তাই মসলিন কখনো বিদেশের উপর নির্ভর ছিলনা এর স্বকীয়তা ছিল সতন্ত্র তাইতো মসলিনকে “ঢাকাই মসলিন” নামে অভিহিত করা হয়। সারা বিশ্বজুড়েই মসলিন কাপড়ের চাহিদা ও সুখ্যাতি ছিল এবং সারা বিশ্বের অধিকাংশ জায়গাতেই মসলিন রপ্তানী। হতো হাজারো সম্ভাবনার মসলিন হাজারো প্রশ্নের জন্মদিয়ে এখন বিলুপ্ত।

অনেকেরই ধারনা যে, ইংরেজদের দুস্কৃতির কারনেই মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়। সোনারগাঁও এর লোকেরা এখনো একটি পুকুর দেখায়। যেখানে মসলিন শিল্পীদের আঙ্গুল কেটে পুকুরে ফেলে দেয়া হয়েছিল। যাতে আর কেউ মসলিন কাপড় তৈরী করতে না পারে। আবার আরেক দিগ দিয়ে প্রশ্ন ওঠে মসলিন দিয়ে ইংরেজরাই বেশ লাভবান হতো তাই তারা কেন ধ্বংস করবে এই মসলিন তবে অনেকের এই ধারনা যে, ইংরেজদের বিলাতে কলের তৈরী করা সস্তা ও নিম্ন মানের কাপড় বিশ্বময় ছড়িতে দিতেই তারা মসলিনকে ধ্বংস করেছিল। কারন মসলিন ছিল সম্পূর্ণটাই ঢাকাকেন্দ্রীক। তবে এইসব বিষয়গুলো লোকমূখে প্রচলিত। ১৯৫২ সালে অধ্যাপক যোগীশচন্দ্র সিংহ গবেষনা করে এর পক্ষেযুক্তি উপস্থাপন করতে পারেননি।

তবে তিনি তার গবেষনার এও উল্লেখ্য করেন যে, তৎকালীন ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজরা তাঁতীদের উপর যথেষ্ট অত্যাচার ও অবিচার করত। ঠকিয়ে কম মূল্যে ইচ্ছার বাইরে কাজ করাত, কাসিমবাজারের সিল্ক শিল্পীদের উপর এতই অত্যাচার করা হয়েছিল যে, অত্যাচার নির্যাতন সহ্যকরতে না পেরে এই কাজ থেকে অব্যাহতি পেতে শিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের হাতের আঙ্গুল কেটে ফেলেছে। মসলিন শিল্পের যতসব ইতিহাস সব ইংরেজরাই লিপিবদ্ধ করেছেন তাই এও সন্দেহজাগে হয়ত ইংরেজরা তাদরে ইচ্ছে মত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারে। সত্য যাই হোক মসলিন আজ বিলুপ্ত যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় তাই পৃথিবীতে যতগুলি মসলিন কাপড় অবশিষ্ট রয়েছে তা যথাযথ ভাবে সরক্ষন করা উচিত না হলে ঢাকাই মসিলন কাপড় আগামী প্রজন্ম হয়তো চোখেও দেখবেনা।

_ লেখক : সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful